শুধু ডিগ্রি কেন যথেষ্ট নয়- বাংলাদেশের তরুণদের অদৃশ্য সংকট ও সমাধান

  • মোঃ রবিউল ইসলাম ও ড. রনক চন্দ্র মহান্ত
  • 15 Sep, 2026, 08:44 PM
শুধু ডিগ্রি কেন যথেষ্ট নয়- বাংলাদেশের তরুণদের অদৃশ্য সংকট ও সমাধান মোঃ রবিউল ইসলাম ও ড. রনক চন্দ্র মহান্ত
ad
একটা প্রশ্ন প্রায়ই মনে আসে — বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করছেন, হাজার হাজার তরুণ ফ্রিল্যান্সিং-এ কোডিং, গ্রাফিক ডিজাইন বা ডিজিটাল মার্কেটিং শিখে ফেলছেন, তবু কেন আমাদের চারপাশে এত হতাশা? কেন এত প্রতিভাবান মানুষ পরিশ্রম করেও প্রত্যাশিত সাফল্য পাচ্ছেন না? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে শিক্ষিত বেকারত্বের হার (স্নাতক ও তার বেশি শিক্ষিতদের মধ্যে) সাধারণ বেকারত্বের হারের তুলনায় বহুগুণ বেশি — যার অর্থ, শুধু ডিগ্রি বা কারিগরি জ্ঞান অর্জন করাই যথেষ্ট নয়।
উত্তরটা লুকিয়ে আছে একটি সহজ কিন্তু প্রায়ই উপেক্ষিত সত্যে — আমরা “কী শিখব” তা নিয়ে যতটা মাথা ঘামাই, “কীভাবে সেই জ্ঞানকে বাজারে বিক্রি করব, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ব এবং টিকিয়ে রাখব” তা নিয়ে ততটা মাথা ঘামাই না। প্রায় সাড়ে সতেরো কোটি মানুষের এই দেশে, যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ শতাংশ কর্মক্ষম বয়সের (১৫-৬৪ বছর) তরুণ, সেখানে এই “সফটস্কিলের” অভাবই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য সংকট। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলোতে বারবার বলা হয়েছে — আগামী দশকে যে দক্ষতাগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি বাড়বে, তার শীর্ষে থাকবে জটিল সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তন, সৃজনশীলতা ও মানুষ পরিচালনার ক্ষমতা — যন্ত্র নয়, মানুষই যা সবচেয়ে ভালো করতে পারে।
বয়স অনুযায়ী শিক্ষার হার ও বেকারত্বের হার তরুণ বয়সে (১৫-২৪ বছর) শিক্ষার হার সবচেয়ে বেশি হলেও একই বয়সসীমায় বেকারত্বের হারও সবচেয়ে বেশি — এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, শুধু শিক্ষাগত সার্টিফিকেট থাকলেই কর্মসংস্থান বা ব্যবসায়িক সাফল্য নিশ্চিত হয় না। নিচের চিত্রে এই সম্পর্কটি স্পষ্ট:
কারিগরি জ্ঞান আছে, কিন্তু বিক্রি করতে জানি না — যোগাযোগ ও দর-কষাকষির সংকট
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ফ্রিল্যান্সার সরবরাহকারী দেশ — অনলাইন লেবার ইনডেক্স ও বিভিন্ন গিগ-ইকোনমি জরিপে বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি ফ্রিল্যান্সার-সরবরাহকারী দেশের তালিকায় থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন ভারতীয় বা ফিলিপিনো ফ্রিল্যান্সার যে কাজের জন্য দ্বিগুণ-তিনগুণ পারিশ্রমিক পান, একজন বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার সেই একই দক্ষতা নিয়েও পান অনেক কম। কারণটা কারিগরি জ্ঞানের অভাব নয় — কারণ হলো ইংরেজিতে আত্মবিশ্বাসী যোগাযোগ, ক্লায়েন্টের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি এবং নিজের কাজের মূল্য দর কষাকষি করে বোঝানোর ক্ষমতার অভাব। যিনি নিজের কাজের গল্প বলতে জানেন না, বাজার তাকে তার যথাযোগ্য মূল্য দেয় না — এটাই নির্মম সত্য।
তরুণদের জন্য বাস্তব পরামর্শ: প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট ইংরেজি লেখা ও কথা বলার চর্চা করুন — ইউটিউব, Duolingo, বা BBC Learning English-এর মতো ফ্রি রিসোর্স ব্যবহার করে শুরু করা যায়। Upwork বা Fiverr-এ প্রোফাইল খোলার আগে একটি “প্রোপোজাল টেমপ্লেট” তৈরি করুন যেখানে নিজের কাজের মূল্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা থাকে, শুধু কম দাম দিয়ে কাজ পাওয়ার চেষ্টা না করা । 
স্থানীয় কোন ক্লাব বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং সোসাইটিতে যুক্ত হওয়া উপস্থাপনা ও কথা বলার আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর একটি কার্যকর উপায়।
ফেসবুক-নির্ভর ব্যবসা: প্রোডাক্ট আছে, ক্রেতার মন জয় করার কৌশল নেই
আমাদের দেশে ফেসবুক-কেন্দ্রিক এফ-কমার্সের বিস্ফোরণ ঘটেছে — বাংলাদেশে সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে গেছে, এবং সহজে অনলাইন পেজ খোলার সুযোগ থাকায় প্রতিদিন হাজারো নতুন উদ্যোক্তার জন্ম হচ্ছে। কিন্তু একই পণ্য নিয়ে হাজার প্রতিযোগী থাকায় এখন প্রশ্নটা প্রোডাক্টের মান নিয়ে নয়, প্রশ্নটা হলো — কে গ্রাহকের মনে জায়গা করে নিতে পারছে? যিনি একটা ভালো গল্প বলতে জানেন, গ্রাহকের সমস্যা বুঝে সমাধান হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন, তিনিই এগিয়ে থাকেন। এখানেও সেই একই সংকট — বিক্রয় ও মার্কেটিং মাইন্ডসেটের অভাব।
তরুণদের জন্য বাস্তব পরামর্শ: ব্যবসা শুরু করার আগে অন্তত ১০-১৫ জন সম্ভাব্য গ্রাহকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের সমস্যা ও চাহিদা বোঝার চেষ্টা করুন — এটিকে বলা হয় “কাস্টমার ডিসকভারি,” যা বিনা খরচে করা সম্ভব। কনটেন্ট তৈরির সময় শুধু পণ্যের ছবি না দিয়ে “সমস্যা-সমাধান” ধরনের গল্প বলুন।
কপিরাইটিং ও কনটেন্ট মার্কেটিং শেখার জন্য Google Digital Garage বা HubSpot Academy-র মতো ফ্রি কোর্স কাজে লাগানো যায়।
মূলধন নয়, ব্যর্থতার আসল কারণ হিসাব-নিকাশে দুর্বলতা, আমরা প্রায়ই শুনি — “মূলধন না থাকায় ব্যবসা দাঁড় করাতে পারলাম না।“ কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, বহু ছোট উদ্যোগ (SME/MSME) বন্ধ হয়ে যায় মূলধনের অভাবে নয়, বরং যে টাকা হাতে ছিল তার সঠিক ব্যবস্থাপনা না জানার কারণে। বাংলাদেশে SME সেক্টর জাতীয় GDP-তে বড় ভূমিকা রাখে এবং কর্মসংস্থানের একটি বিশাল উৎস, কিন্তু অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোগ প্রথম তিন-পাঁচ বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। নগদ প্রবাহ কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, কখন পুনর্বিনিয়োগ করতে হয়, কীভাবে সঠিক মূল্য নির্ধারণ করতে হয় — এই মৌলিক আর্থিক সাক্ষরতার অভাবেই বহু স্বপ্ন অকালে ঝরে যায়।
তরুণদের জন্য বাস্তব পরামর্শ: 
একটি সাধারণ খাতা বা মোবাইল অ্যাপ দিয়ে প্রতিদিনের আয়-ব্যয় লেখা শুরু করুন — এটিই আর্থিক সাক্ষরতার প্রথম পদক্ষেপ।
ব্যবসা শুরুর আগে “ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট” (কত বিক্রি হলে খরচ পুষিয়ে যাবে) হিসাব করে নেওয়া অভ্যাস করুন। বাংলাদেশ ব্যাংক, SME ফাউন্ডেশন বা বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত ফ্রি আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করুন।
সমস্যা নয়, সমস্যা-সমাধানের সাহস চাই, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সরবরাহ চেইনের জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা — এসব বাংলাদেশে ব্যবসা করার নিত্যদিনের বাস্তবতা। কিন্তু ইতিহাস বলে, যারা এই প্রতিবন্ধকতাগুলোকে সৃজনশীলভাবে মোকাবিলা করার সাহস দেখিয়েছেন, তারাই টিকে গেছেন এবং এগিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে যারা সফল হয়েছেন, তাদের প্রায় সবার গল্পেই দেখা যায় — তারা একটি নির্দিষ্ট সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরি করেছেন, বিদেশি মডেল কপি করে নয়।
তরুণদের জন্য বাস্তব পরামর্শ: আশেপাশের মানুষের প্রতিদিনের সমস্যাগুলো খাতায় লিখে রাখার অভ্যাস করুন — এখান থেকেই ব্যবসায়িক আইডিয়া তৈরি হয়।
বড় বাজেট ছাড়াই ছোট পরিসরে (“পাইলট” আকারে) আইডিয়া পরীক্ষা করে দেখুন, ব্যর্থ হলেও তা থেকে শেখার চেষ্টা করুন।
স্টার্টআপ বাংলাদেশ, iDEA প্রজেক্ট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনকিউবেশন সেন্টারে যুক্ত হয়ে মেন্টরশিপ ও নেটওয়ার্কিং সুযোগ কাজে লাগান।
একা লড়াই করে বড় হওয়া যায় না — নেতৃত্ব ও টিম ব্যবস্থাপনা শেষ কথা হলো নেতৃত্ব নিয়ে। একজন উদ্যোক্তা একা শুরু করতে পারেন, কিন্তু একা কখনো বড় হতে পারেন না। আমাদের বিশাল তরুণ জনশক্তিকে সঠিকভাবে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা করার ক্ষমতাই একটি ব্যবসাকে একটি ছোট দোকান থেকে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে। যে উদ্যোক্তা টিম গড়তে জানেন না, দায়িত্ব ভাগ করে দিতে পারেন না, বা কর্মীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারেন না — তার ব্যবসা একটি নির্দিষ্ট আকারের বেশি কখনো বাড়ে না।
তরুণদের জন্য বাস্তব পরামর্শ: ছোট দল নিয়ে কাজ করার সুযোগ থেকেই নেতৃত্বের অনুশীলন শুরু করুন — বড় ব্যবসায় নেতৃত্ব দেওয়ার আগে ছোট পরিসরে শিখে নেওয়া সবচেয়ে সহজ। সপ্তাহে অন্তত একবার নিজের দলের সদস্যদের কাছ থেকে সরাসরি ফিডব্যাক নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন।
“মাইক্রো-ম্যানেজমেন্ট” এড়িয়ে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া (delegation) শেখার চেষ্টা করুন।
সারসংক্ষেপ: এক নজরে পাঁচটি সফটস্কিল ও করণীয় সফটস্কিল মূল সমস্যা তরুণদের প্রথম পদক্ষেপ যোগাযোগ ও দর-কষাকষি কম মূল্যে কাজ করা দৈনিক ইংরেজি চর্চা, প্রোপোজাল টেমপ্লেট তৈরি ডিজিটাল মার্কেটিং ও সেলস বিক্রি না হওয়া কাস্টমার ডিসকভারি, গল্প-ভিত্তিক কনটেন্ট
আর্থিক সাক্ষরতা ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়া আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, ব্রেক-ইভেন হিসাব সমস্যা সমাধান প্রতিবন্ধকতায় থমকে যাওয়া সমস্যা লিখে রাখা, ছোট পরিসরে পরীক্ষা নেতৃত্ব ও টিম ব্যবস্থাপনা ব্যবসা না বাড়া ছোট দলে নেতৃত্বের অনুশীলন, ফিডব্যাক নেওয়া সময় এসেছে অগ্রাধিকার বদলানোর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি উদ্যোগগুলো — বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, a2i, স্টার্টআপ বাংলাদেশ বা iDEA প্রজেক্টের মতো প্ল্যাটফর্ম — যদি প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এই পাঁচটি সফটস্কিলকে গুরুত্ব দিয়ে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলেই আমাদের বিপুল তরুণ জনশক্তি সত্যিকারের অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।
তরুণ পাঠকদের প্রতি আমার সরাসরি আহ্বান — উপরে উল্লেখিত ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোর যে কোনো একটি আজই শুরু করুন। একটি খাতা খুলে আয়-ব্যয় লেখা শুরু করুন, একজন সম্ভাব্য গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলুন, অথবা আজ রাতেই ১৫ মিনিট ইংরেজি চর্চা করুন। বড় পরিবর্তন সবসময় ছোট, ধারাবাহিক অভ্যাস থেকেই শুরু হয়।
১৭.৫ কোটি ছুঁইছুঁই এই জনসংখ্যার দেশে প্রতিভার অভাব নেই। অভাব আছে সেই প্রতিভাকে বাজারযোগ্য করে তোলার দক্ষতায় — যোগাযোগ, বিক্রয়-মার্কেটিং, আর্থিক সাক্ষরতা, সমস্যা সমাধান এবং নেতৃত্ব। এই পাঁচটি সফটস্কিলই হতে পারে আমাদের তরুণদের আসল মূলধন — যা কোনো ব্যাংক ঋণ দিতে পারবে না, নিজেকেই অর্জন করতে হবে।
লেখকদ্বয় আন্তর্জাতিক উন্নয়নকর্মী, আন্তর্জাতিক সংস্থায় গবেষণা কাজে জড়িত: ইমেইল- ranakcm@gmail.com


Comment